তো, শুরুতে সাড়ে নয়টার দিকে ফুলবাড়ি গেট গেলাম৷ সেখানে গিয়ে বন্ধু শোয়েবকে কল দিলাম কুয়েটের সামনে দিয়ে কোনো বাস যায় কি না জানতে। তো শোয়েব বললো এদিক দিয়ে যায় না (যদিও আমি একটা দেখেছি বাস, সেটা পাবনা টু পাথরঘাটার বাস, বিআরটিসির, কুষ্টিয়া-যশোর হয়েও যায়), সোনাডাঙা হয়ে যেতে হবে। সিএনজিতে করে শিববাড়ি মোড়ে গেলাম (৩০ টাকা ভাড়া), সেখান থেকে ৫ টাকা অটো ভাড়া দিয়ে সোনাডাঙা বাস স্ট্যান্ডে।
বাসের অবস্থা কোনোটাই ভালো না, বাসটা পটুয়াখালী বলে ডাকতেছিলো, তো সেটা বাগেরহাট হয়ে যাবে। ভাড়া ১০০ টাকা, আগে ৮০ টাকা ছিলো। জানালার পাশে সিটের জন্য পিছনের দুটো সিট আগে বসলাম। সিটের অবস্থা যাচ্ছে তাই৷ যাই হোক, আমি এক পাশে বসলাম, অন্যপাশ ভর্তি, কারণ ও পাশে রোদ পড়বে না। কিছু করার নেই, মন খারাপ করে একপাশের জানালা পেয়েই খুশি। বাস ছাড়তে ছাড়তে ১০.৪০ প্রায়।
বাস থামতে থামতে আগাচ্ছে। আমি ম্যাপে আগেই পুরো এরিয়া অফলাইনে ডাউনলোড করে রাখছিলাম, একটু পরপর ম্যাপে ঢুকে দেখি। ফোনের চার্জ যাতে কম যায়, তাই ব্যাটারি সেভার মোড অন করাই ছিলো। ১২ কিমি রাস্তা যখন বাকি, তখন হালকা ঘুম আসলো, ভাবলাম একটু ঘুমিয়ে নেই। বাস তো আস্তেই আগাচ্ছে। কিন্তু দুুঃখের বিষয় ওই ১২ কিমি-ই বাস সবচেয়ে দ্রুত গেছে। ঘুম থেকে উঠে দেখি পাশেরজন খান জাহান আলীর মাজারে নামতেছে। জিজ্ঞেস করলাম, ভাই ষাট গম্বুজ কি সামনে না পিছনে (ম্যাপের হিসেবে পিছনে হওয়ার কথা)?
উনি বললো, ভাই মাত্রই তো ষাট গম্বুজ ফেলে আসলাম। তাড়াতাড়ি নামলাম, যেহেতু মাজারে চলে আসছি। নিচে নেমে শুনলাম রাস্তার বিপরীত পাশে যাওয়া লাগবে। ম্যাপে একবার দেখে নিলাম। যাওয়ার সময় রাস্তার পাশের দোকান থেকে দুটো সিঙ্গারা খেয়ে নিলাম।
সিঙ্গারা খেয়ে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। একটু সামনে এসে দেখলাম দুপাশে কিছু আচার, বাদাম (পতেঙ্গার মতো) ইত্যাদির দোকান। ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে কিছু শোপিসের দোকানও৷ মাজারে কাছে রাস্তাটা একটু ঢালু হয়ে উপরে উঠে গেলো। আশপাশে কিছু খাবারের হোটেলও ছিলো। ভিতরে ঢুকে মাজার দেখলাম। সামনে একটা দীঘিও আছে। দীঘির পাশেই দেখলাম বেশি মানুষ। সময় প্রায় দুপুর ১২ টা। মধ্য দুপুরের তপ্তদাহে মানুষ পুকুরপাড়ে বসে বাতাস খাচ্ছে৷ আশপাশে ছোটোখাটো হকার ছিলো… আইসক্রিমওয়ালা, ঝালমুড়িওয়ালা থেকে শুরু করে আচারওয়ালা সবই ছিলো। আমি নিজে গরমে অতিষ্ট হয়ে আইসক্রিম, আর একটু পরে পেয়ারা খেয়েছিলাম। পাশে দেখলাম ট্যুরিস্ট পুলিশের গাড়ি একটা। সেখান থেকে ঘুরেটুরে মেইন রোডে আসলাম। সেখান থেকে ১০ টাকার অটো ভাড়ায় ষাট গম্বুজ মসজিদ।
ষাট গম্বুজ মসজিদে প্রবেশের সময় টিকিট কাটলাম, কিন্তু গেট দিয়ে ঢোকার সময় টিকিট চেক করলো না। পরে বুঝলাম টিকিট শুধু জাদুঘরে প্রবেশের জন্য। যাই হোক, আমি দু পাশ ঘুরে বেরালাম মসজিদের। ভিতরে পরে ঢুকবো মনস্থির করেছি। একটু পরেই জোহরের আজান দিবে। তখন ভিতরে নামাজ পড়ার জন্য তো ঢুকবোই। মসজিদের পিছনে বিশাল দীঘি রয়েছে – নাম তার ঘোড়াদীঘি। সেখানে বসার জন্য একটু পরপর কনক্রিটের বেঞ্চও পাতা আছে। একটা বাঁধানো ঘাটও রয়েছে। বসার জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি, একটু পরেই আকাশ কাঁপিয়ে ঝুম বৃষ্টি নেমে এলো, আশপাশের মানুষজন সব সরে যেতে শুরু করলো। কেউ কেউ মসজিদে ঢুকে গেলো, কেউ কেউ মসজিদের পিছনের গেটের নিচে আশ্রয় নিলো। আমি ছাতা নিয়ে আনন্দের সাথেই খানিকক্ষণ বেঞ্চে বসলাম, তবে বেশিক্ষণ বসতে পারিনি বৃষ্টি তেড়ে আসাতে। আমি ঘাটের পাশের বিশালাকৃতির গাছের আড়ালে চলে গেলাম বাতাস এড়াতে; ছাতা বৃষ্টি ঠেকাতে পারলেও বাতাস ঠেকাতে পারে না। একটু পরেই বৃষ্টি থেমে গেলো, আকাশে তখন আলো-আধারির খেলা শেষ, মেঘগুলো ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিলো, বিশাল দীঘির মহত্ত্বও ধীরে ধীরে পরিস্ফুটিত হচ্ছিলো। জনশ্রুতি আছে এই যে, এই দীঘিতে খান জাহান আলীর দুটি বৃহৎ আকৃতির কুমির ছিলো, একটির নাম ছিলো কালাপাহাড়, অপরটির নাম ছিলো ধলাপাহাড়। যদিও পরে আমি একটি কুমিরের দেহাবশেষ দেখতে পাই জাদুঘরে, সে কথায় পরে আসছি।
লোকমুখে অনেক কথা শোনা যায়, এ দুটি কুমির নিয়ে, যেমন তিনি কুমিরের পিঠে চড়ে এ এলাকায় এসেছেন – এমন টাইপ কথাবার্তা। বাট অনেকে ব্যাখ্যা করেছেন এইভাবে যে, মানুষ যাতে দীঘির পানি নষ্ট না করে, সে জন্যই খান জাহান আলী দীঘিতে কুমির ছেড়েছিলেন। কুমিরের ভয়ে মানুষ এ দীঘি এড়িয়ে চলতো।

ষাট গম্বুজ মসজিদ ও জাদুঘর দেখে পরবর্তীতে বের হয়েই সামনে কিছু খাবারের দোকান চোখে পড়লো, খেয়ে নিলাম। দাম যতটা না অতিরিক্ত, খাবারের স্বাদ তার চেয়েও বেশি জঘন্য। পরে বাগেরহাটের বন্ধু প্রিন্সকে কল দিলাম এ এলাকায় কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায় জানার জন্য, বেচারা জানালো যে এখানে ঘুরতে যাওয়ার তেমন আর স্থান নেই, যেতে চাইলে চন্দ্রমহল যেতে পারি। ষাট গম্বুজের সামনে থেকে অটো রিকশায় চড়ে কাটাখালীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। কাটাখালী থেকে যেতে হবে চন্দ্রমহল।

কাটাখালীতে এসে কোনদিকে যাবো সেটা যখন ঠাহর করতে পারছিলাম না, তখন ভোজবাজির মতো উদয় হলো পরশ। পরশ আমার ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র, বন্ধু নাইমের রোলমেট, সেই হিসেবে তেলবাজও বটে, প্রচুর বকবক করে ছোকরা, পুরো রোলমেটের কপি।
(চলবে)